
জামাল আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার (সিলেট):
সিলেট তামাবিল মহাসড়কে অভিনব কায়দায় নাম্বারবিহীন ও ‘রোহিঙ্গা ‘ সিএনজিতে চলছে রমরমা টোকেন বাণিজ্য। পট পরিবর্তনের পর কিছু দিন থেমে থাকলেও নতুন উদ্যমে শুরু হয়েছে তাদের এ টোকেন বাণিজ্য। এর আগে অর্থের বিনিময়ে নাম্বার বিহীন অবৈধ সিএনজি অটোরিকশার সামনের গ্লাসে টোকেন স্টিকার লাগিয়ে পরিবহণ চলাচল করত। তবে এখন টোকেন বাণিজ্যের কৌশল পালটেছে পুলিশ। ৫ আগস্টের পর থেকে টোকেন কিছু কিছু গাড়ির গ্লাসে লাগানো হচ্ছে অথবা চালকের মোবাইলের পেছনে লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, বিশেষ কৌশলে এখন বেশিরভাগ চালকের পকেটে পকেটে রাখতে হচ্ছে এ টোকেন । এর নাম দেয়া হয়েছে পুলিশ টোকেন । টোকেন বাবদ এজেন্টের মাধ্যমে আগে নেওয়া হতো ৪০০-৬০০ টাকা এখন তা দ্বিগুণ করা হয়েছে। সিলেটের কানাইঘাট থানা ট্রাফিকপুলিশ ও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ-এসএমপি, জেলা ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তার নেতৃতে এ টোকেন বাণিজ্যের ভাগ এসএমপি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা পেয়ে থাকেন। পুলিশের বড় কর্তারা এ বাণিজ্যের কথা জানলেও বন্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তবে পুলিশের দাবি এ বাণিজ্যের সঙ্গে তারা জড়িত নয়। একটি অপরাধ সিন্ডিকেট জড়িত।
অনুসন্ধানে সিলেট তামাবিল মহাসড়ক ও কানাইঘাটে সরজমিন থেকে নাম্বারবিহীন ও ‘রোহিঙ্গা ‘ টোকেন ব্যবহৃত সিএনজি চালকদের সাথে কথা বললে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চালকরা জানান, আমরা কানাইঘাট বাজার থেকে ফেসিঞ্জার /যাত্রী (টিফ) নিয়ে দরবস্ত বাজারে প্রতিদিন যাওয়া আসা করি দিনে তিন চারটিফ হয়, এদিকে আমরা দরবস্ত থেকে জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, হরিপুর, চিকনাগুল, সিলেট মেজরটিলা পর্যন্ত যাত্রী নিয়ে যাওয়া আসাকরি। আমাদের কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাটে বেশিরভাগ গাড়ির কোন কাগজপত্র নেই নাম্বারবিহীন ও ‘রোহিঙ্গা ‘গাড়ি বটে এতে কানাইঘাট,জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ট্রাফিক পুলিশ ও তামাবিল হাইওয়ে পুলিশ প্রতিদিন চেকপোস্ট বসিয়ে আমাদের কাগজপত্র চেক করেন আমরা শলে কৌশলে একাধিকবার তাদের মামলার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি। তারপরে আমরা নাম্বারবিহীন সিএনজি ও কাগজের মেয়াদবিহীন গাড়িগুলোতে তাদের নির্ধারিত টোকেনের লাইনম্যানদের কাছ থেকে ৫০০-৬০০ টাকা দিয়ে টোকেন কিনে চলি। গ্যাস আনতে পিরেরবাজার গ্যাস পাম্পে যেতে হয় প্রতিদিন আবার মাঝে মাঝে যাত্রী নিয়ে জৈন্তাপুর জাফলং, গোয়াইনঘাট, জকিগঞ্জসহ সিলেট শহর টিল্লাগর, শিবগঞ্জ পর্যন্ত যেতে হয়, এতে কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ট্রাফিক পুলিশ, মেট্রো টহল পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ বা মেট্রো ট্রাফিক পুলিশ গাড়ি আটকালে মোবাইল বের করে বা পকেট থেকে টোকেন দেখালেই মেলে দ্রুত ছাড়ের সিগন্যাল। না হলে নানা অজুহাতে আটকানো হয় গাড়ি করা হয় মোটা অংকের জরিমানা না হলে মামলা দিয়ে দেন তারা।
এ টোকেন পরিচালনায় মাঠপর্যায়ের ১০-১৫ জনকে দিয়ে এ টোকেন বাণিজ্য চলছে। তাদের সঙ্গে জড়িত আছেন পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তাও। পতিত সরকারের আমল থেকে এ বাণিজ্য করে এই টোকেন দালালরা রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েগেছেন। আর পুলিশ কর্মকর্তাদের পকেটে তুলে দিয়েছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলে টোকেন বাণিজ্যে ভাটা পড়ে। মাঝখানে কিছুদিন পুলিশও ছিল নিষ্ক্রিয়। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার স্বরূপে ফিরেছেন সার্জেন্টরা।
সংশ্লিষ্ট এমন একাধিক সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ-এসএমপি ও জেলা ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশের অনেক কর্মকর্তা বদলি হলেও ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হিসাবে পরিচিত ও চিহ্নিতরা এখনও বহাল রয়েছেন। যাদের মধ্যে পতিত সরকারের একাধিক সংসদ-সদস্যের আস্থাভাজন ও বিশ্বস্ত ‘সিলেটি সার্জেন্ট’ও রয়েছেন। যারা নেতাদের পরিচয়ে পুলিশে ক্ষমতার চড়ি ঘুরাতেন। তারাই ট্রাফিক বিভাগের টোকেন বাণিজ্য দেখভাল করছেন। টিআই, সার্জেন্ট/টিএসআই, এটিএসআই পদবিধারী কর্মকর্তারা ও কিছু সংখ্যক পুলিশ ফাড়ির কর্মকর্তারা এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। টোকেন হিসাবে স্টিকার দিয়ে এসব পুলিশ সদস্য ও দালালরা প্রতি মাসে সিএনজি অটোরিকশা চালকদের কাছ থেকে তুলছে অর্ধকোটি টাকারও বেশি। যার ভাগ পায়, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ-এসএমপি ও জেলা ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা। বিশেষ করে সিলেটের কানাইঘাট থানা ট্রাফিক পুলিশ, জৈন্তাপুর তামাবিল হাইওয়ে পুলিশ ফাড়ি, জৈন্তাপুর ট্রাফিক, গোয়াইনঘাট, শাহপরাণ (রহ.) থানাগুলো শাহপরাণ (রহ.)মাজার পুলিশ ফাড়ি এই টোকেন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। এর ভাগ পায় জেলা পুলিশের একটি চক্রও।
সিলেটের কানাইঘাটে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, তামাবিল হাইওয়ে পুলিশ ও কানাইঘাট থানা ট্রাফিক পুলিশ প্রতিদিন নাম্বারবিহীন ও ‘রোহিঙ্গা’ সিএনজি গাড়িগুলোতে টোকেন তল্লাশি করছেন। এ টোকেন যে গাড়িগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে না এই গাড়িগুলিতে দিচ্ছেন বড় ধরনের মামলা না হয় করছেন মোটা অংকের জরিমানা অনেক সময় করছেন রফাদফা। এতে ভয়ে চালকরা টোকেন লাগাতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানান তারা ।
কানাইঘাট থেকে ছেড়ে আসা দরবস্তগামী যাত্রীবাহী
এক নাম্বারবিহীন সিএনজির চালককে এ টোকেন কোথায় পাওয়া যায় জিগ্যেস করলে তিনি উত্তরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হয়ে বলেন দরবস্ত বা কানাইঘাট সিএনজি স্ট্যাশনের ম্যানেজারদের সাথে যোগাযোগ করলে এ টুকেন পাবেন। তাদের কাছ থেকে আমরা প্রতি মাসের ১-৫ তারিখের মধ্যে এ টুকেন ক্রয় করে রাখি আগে গাড়ির সামনের গ্লাসে লাগাতে হতো এখন আমাদের মোবাইলের পিছনে অথবা প্যান্টের পকেটে রাখতে হয়। এটা টোকেন বানিজ্যের ও পুলিশ কতৃপক্ষের নাকি নিয়ম।
এবিষয়ে কানাইঘাট থানা ট্রাফিক পুলিশের টিএসআই রজত বলেন, নাম্বারবিহীন ও ‘রোহিঙ্গা’ অনটেস সিএনজিতে অভিযান করে থাকি। আমাদের নাম ভাঙ্গিয়ে কেও যদি ঐসব টোকেন বানিজ্য করে তাহলে এগুলো তো আমাদের কিছু করার নাই।
তামাবিল হাইওয়ে পুলিশের অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, আমরা প্রতিদিন চেকপোস্ট বসিয়ে নাম্বারবিহীন সিএনজিগুলো আটক করতেছি, মামলা দিতেছি। অনেক ড্রাইভাররা ঐসব টোকেন আমাদেরকে দেখায় তাতে আমরা এই গাড়িগুলো আরও বেশি আটক করি। এবং সাথে সাথে মামলা দিয়ে দেই।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ২য় পর্বে আসছে টোকেন হোতাদের নাম ও ছবি, পুলিশ মাসোহারা কয়টাকা গুনতে হচ্ছে।
![]()